কুলেন্দু শেখর দাস, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
লোকসংগীতের অন্যতম দিকপাল, ধামাইল গানের স্রষ্টা এবং বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থের ১১০তম প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে তার অগণিত ভক্তবৃন্দরা দিনটিকে গভীর শ্রদ্ধা ও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালন করছেন। ১৯১৫ সালের ১০ নভেম্বর (১৩২২ বঙ্গাব্দের ২৬ কার্তিক, শুক্রবার) এই মরমি সাধক ৮২ বছর বয়সে তাঁর জন্মস্থান সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
এই দিবসটি উপলক্ষে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় সংস্কৃতি কর্মীরা কবির জন্মভিটা জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে দুই দিনব্যাপী (৯ ও ১০ নভেম্বর) বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
কবির প্রয়াণ দিবসে তাঁকে স্মরণ করেছেন সুনামগঞ্জের বর্তমান প্রজন্মের এক লোকসংগীত শিল্পী মাধুরী তালুকদার। তিনি রাধারমণকে তাঁর শিল্পী জীবনের মূল অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেন।
মাধুরী তালুকদার বলেন, “আমি ছোটবেলা থেকে মা-কাকিদের মুখে বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থয়ের গান শুনে বড় হয়েছি। ২০০৩ সালে সাংস্কৃতিক সংগঠন লোকদল শিল্পী গুষ্টির শিক্ষাগুরু অ্যাড: দেবদাস রঞ্জন চৌধুরীর কাছে আমার হাতেখড়ি। পরে লোকসংগীত-সংগ্রাহক ও গবেষক ড: বিশ্বজিৎ রায়ের গাওয়া রাধারমণের গান শুনে অনুপ্রাণিত হই।”
তিনি আরও জানান, ২০০৬ সালে সুনামগঞ্জ পৌর চত্বরে রাধারমণ দত্তের বিখ্যাত গান “আমারে আসিবার কথা কইয়া, মান করে রাই রইয়াছ ঘুমাইয়া” পরিবেশনের পর তাঁকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ বেতারের নিয়মিত শিল্পী এবং আন্তর্জাতিক রাধারমণ সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্রের শিল্পী হিসেবে কবির গানকে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
রাধারমণ দত্ত ছিলেন একাধারে গীতিকার, সুরকার, শিল্পী এবং বৈষ্ণব সহজিয়া মতবাদের সাধক। বিভিন্ন সংগ্রাহকদের মতে, তাঁর রচিত গানের সংখ্যা তিন হাজারেরও বেশি। তাঁর গানের বৈচিত্র্যময় বিষয়বস্তুর মধ্যে রয়েছে প্রার্থনা, আত্মতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, এবং স্বদেশ প্রেমের গান। তবে তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান হলো ধামাইল গান, যা সিলেট ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বিপুল জনপ্রিয়।
তাঁর রচিত বিখ্যাত গানগুলোর মধ্যে রয়েছে—‘জবা কুসুম সন্ধ্যামালী আনরে তুলিয়া মনোরঙ্গে সাজাও কুঞ্জ’, ‘মুর্শিদ বলি নৌকা ছাড়ো’ এবং ‘দেখলাম দেশের এই দুর্দশা, ঘরে ঘরে চুরের বাসা’। কবির অমূল্য সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণ হলেও তাঁর স্মৃতি রক্ষা নিয়ে স্থানীয় সংস্কৃতি কর্মীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। রাধারমণ দত্তের নিজ ভূ-সম্পত্তি অর্পিত হওয়ায় এবং তাঁর বিশাল গানের সংগ্রহ (যেমন সতীশ রায়ের সহস্রাধিক গান) হারিয়ে যাওয়ায় ভক্তরা বেদনাহত।
সংস্কৃতি কর্মী ও ভক্তরা দীর্ঘদিন ধরে রাধারমণের গানের চর্চা বাড়াতে তাঁর জন্মভিটায় দ্রæত রাধারমণ কমপ্লেক্স নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন।
বাংলাদেশ ধামাইল উন্নয়ন পরিষদ সুনামগঞ্জ শাখার সভাপতি দেবদাস চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক চিনু চক্রবর্তী বলেন, “রাধারমণ কমপ্লেক্স নির্মাণে আর কালক্ষেপণ নয়: লোক-সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা চাই”
“আজ বাংলা লোকসংগীতের এক অমর সাধক, ধামাইল গানের জনক রাধারমণ দত্তের ১১০তম প্রয়াণ দিবস। ‘তোমরা কুঞ্জ সাজাও গো’ বা ‘কারে দেখাব মনের দুঃখ গো’—তাঁর প্রতিটি গানই আমাদের প্রাণের স্পন্দন। আমরা গভীর শ্রদ্ধার সাথে তাঁকে স্মরণ করছি। কিন্তু একই সঙ্গে গভীর হতাশার সাথে আমরা জানাতে চাই, ২০১৫ সালে তাঁর জন্মভিটায় রাধারমণ কমপ্লেক্স নির্মাণের ঘোষণা ও সাইনবোর্ড টাঙানোর দীর্ঘ সাত বছর পেরিয়ে গেলেও আজও নির্মাণ কাজ শুরু হয়নি। এটি শুধু রাধারমণ অনুরাগীদের নয়, সমগ্র লোক-সংস্কৃতির প্রতি এক চরম অবহেলা। আমরা সরকারের কাছে জোর দাবি জানাই, ভূমি জটিলতা দূর করে অবিলম্বে এই কমপ্লেক্সের নির্মাণ কাজ শুরু করা হোক। এই কমপ্লেক্সটি শুধুমাত্র একটি ভবন নয়, এটি হবে আমাদের সমৃদ্ধ লোক-সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও চর্চার কেন্দ্র, নতুন প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস।”
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে কবির মৃত্যুশতবার্ষিকীতে এই কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও জায়গা নির্ধারণের সাত বছর পরেও নির্মাণ কাজ শুরু হয়নি।
স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা দ্রুুত কমপ্লেক্স নির্মাণ করে কবির প্রতি উপযুক্ত সম্মান জানানোর এবং তাঁর গানের কথা ও সুরের বিকৃতি রোধের জোর দাবি জানিয়েছেন। ##
কুলেন্দু শেখর দাস
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
১০.১১.২৫