শাহ্ ফুজায়েল আহমদ
কবি লেখক সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীঃ
ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র রমজান মাস রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের এক মহিমান্বিত সময়। এই মাসের মধ্যেই রয়েছে এমন এক মহিমান্বিত রজনি, যা হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ—পবিত্র লাইলাতুল কদর। মুসলিম উম্মাহর জন্য এটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ, কল্যাণময় ও পুণ্যময় একটি রাত। এই রাতেই মহান আল্লাহ তাআলা মানবজাতির হেদায়াতের জন্য পবিত্র কোরআনুল কারিম অবতীর্ণ করেন। তাই লাইলাতুল কদর মুসলমানদের জীবনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, “লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।” অর্থাৎ এই এক রাতের ইবাদতের সওয়াব হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও অধিক। এ কারণেই ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এই মহিমান্বিত রাতকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক বিরল সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং ইবাদত-বন্দেগি, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আসকার ও দোয়া-মোনাজাতে রাতটি অতিবাহিত করেন।
লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব তুলে ধরতে পবিত্র কোরআনে ‘আল-কদর’ নামে একটি স্বতন্ত্র সূরা নাজিল হয়েছে। ‘লাইলাতুল কদর’ শব্দের অর্থ মহিমান্বিত বা মর্যাদাপূর্ণ রাত। ফারসি ভাষায় একে ‘শবেকদর’ বলা হয়—যেখানে ‘শব’ অর্থ রাত এবং ‘কদর’ অর্থ মর্যাদা বা ভাগ্য। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী এই রাতেই মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করা হয় এবং আল্লাহর অসীম রহমত, বরকত ও ক্ষমা বর্ষিত হয়।
হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, রমজান মাসের শেষ দশকের যে কোনো বিজোড় রাতে লাইলাতুল কদর হতে পারে। তাই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর উম্মতকে শেষ দশকে বেশি বেশি ইবাদত-বন্দেগিতে মনোনিবেশ করার নির্দেশ দিয়েছেন। অনেক আলেমের মতে ২৬ রমজানের দিবাগত রাতেই লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তবে নিশ্চিতভাবে নির্দিষ্ট কোনো রাত নির্ধারিত হয়নি। এ কারণেই মুসলমানরা শেষ দশকের প্রতিটি বিজোড় রাতে অধিকতর ইবাদতে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।
এই মহিমান্বিত রাতে নফল নামাজ আদায়, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া, তওবা-ইস্তেগফার ও দান-সদকার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা হয়। বিশেষ করে গুনাহ মাফের আশায় আন্তরিকভাবে মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) এই রাতে বেশি বেশি দোয়া করার জন্য শিক্ষা দিয়েছেন—
“আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি।”
অর্থাৎ, হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করে দিন।
লাইলাতুল কদরের শিক্ষা শুধু ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের আত্মশুদ্ধি, সংযম, ধৈর্য, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করারও এক মহান উপলক্ষ। এই রাত মানুষকে অন্যায়-অবিচার থেকে দূরে রেখে সত্য, ন্যায় ও কল্যাণের পথে চলার অনুপ্রেরণা দেয়।
অতএব, পবিত্র লাইলাতুল কদর আমাদের জন্য মহান আল্লাহর এক বিশেষ রহমত ও বরকতের উপহার। এই মহিমান্বিত রাতের তাৎপর্য উপলব্ধি করে প্রত্যেক মুসলমানের উচিত বেশি বেশি ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা এবং ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে শান্তি, ন্যায় ও মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করা।
মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে প্রার্থনা—পবিত্র লাইলাতুল কদরের অসীম রহমত ও বরকত যেন সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ওপর বর্ষিত হয় এবং আমাদের জীবনকে কল্যাণময় ও শান্তিময় করে তোলে। আমিন।